|
'সাজানো বন্দুকযুদ্ধে' পা হারালেন ছাত্রদল নেতা মজিদ !
আজকের কলারোয়া -
17/02/2015
কলারোয়া উপজেলার পৌর ছাত্রদলের সভাপতি আবদুল
মজিদ (৩৬) পুলিশের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' আহত হয়েছিলেন গত ৫
ফেব্রুয়ারি রাতে। চিকিৎসার জন্য গত ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ঢাকায়
নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তিনি পঙ্গু হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা ইতিমধ্যে তাঁর জখম বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ কেটে বাদ দিয়েছেন। অথচ
'বন্দুকযুদ্ধের' আগের দিন সন্ধ্যায় মজিদকে আটক করেছিল
যশোরের শার্শা থানার পুলিশ।
যশোরের পুলিশ বলছে, আদালতে নেওয়ার পথে মজিদ
পালিয়ে গিয়েছিলেন।
কলারোয়া থানার পুলিশের দাবি, মজিদ ২০০২ সালে শেখ
হাসিনার গাড়িবহরে হামলা মামলার আসামি। ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কলারোয়ার কেরালকাতা ইউনিয়নের ঠাকুরবাড়ী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' তিনি আহত হন। তবে মজিদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দাবি, পালানোর কোনো ঘটনাই ঘটেনি। আটকের পর নির্জন স্থানে নিয়ে পুলিশ তাঁর (মজিদের) পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেছে। পরে 'পালানো' ও 'বন্দুকযুদ্ধের'
ঘটনা সাজিয়েছে।
মজিদের বাড়ি কলারোয়ার তুলসীডাঙ্গা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আবদুস সাত্তার। গত ৬ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মজিদ দাবি করেন, গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়ি ছেড়েছিলেন তিনি। গত ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাঁকে শার্শার কায়বা বাজারের একটি ধানের গুদামে বসে টিভি দেখার সময় আটক করে সাদা পোশাকের পুলিশ। সাতক্ষীরা সদর
উপজেলার কাশেমপুর গ্রামের জামায়াতকর্মী শহীদুল ইসলামকেও এ সময় আটক করা হয়। পরদিন বিকেল ৪টার দিকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে যশোর আদালতে নেওয়ার
কথা বলে পুলিশ তাঁদের ভটভটিতে তোলে। সঙ্গে ছিলেন শার্শা থানার এএসআই সোমেন বিশ্বাস। পথে বারবার তাঁর (সোমেনের) মোবাইল ফোন বাজছিল। কথা শুনে বোঝা যাচ্ছিল ওপাশ
থেকে কোনো কর্মকর্তা ঝিকরগাছা বাজার পার হয়ে নতুনহাট এলাকায় একটি ফাঁকা জায়গায় গাড়ি দাঁড় করাতে তাগাদা দিচ্ছিলেন তাঁকে। নতুনহাট এলাকায় একটি ফাঁকা জায়গায়
পেঁৗছালে বিপরীত দিক থেকেআসাএকটিমাইক্রোবাসের
সামনে তাঁদের বহনকারী ভটভটিটি (মহেন্দ্র) দাঁড়িয়ে যায়। মাইক্রোবাস থেকে কালো পোশাক পরা তিনজন সশস্ত্র লোক
তাঁকে (মজিদ) ও শহীদুলকে ওই গাড়িতে তুলে নিয়ে চোখ
বেঁধে ফেলে। পরে তাঁরা এএসআই সোমেন বিশ্বাসকে নির্দেশ
দেন তিনি যেন শহীদুলকেসঙ্গেনিয়েবাসেকরেআদালতেচলেযান।
কালো পোশাক পরা লোকজন সন্ধ্যার দিকে মজিদকে কলারোয়া থানায় সোপর্দ করে। কলারোয়া থানার পুলিশ রাত ১১টার দিকে তাঁকে (মজিদ) একটি গাড়িতে তুলে ঠাকুরবাড়ী নিয়ে যায়। সেখানে তারা প্রথমে শূন্যে তিন- চারটি গুলি ছোড়ে। এরপর তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচে বন্দুক ঠেকিয়ে তিনটি গুলি করে।
পরে তাঁকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। এরপর 'পালানো' ও 'বন্দুকযুদ্ধের' কাহিনী তৈরি করে। মজিদ যে রাতে 'বন্দুকযুদ্ধে' আহত হন, সে রাতেই যশোর- খুলনা মহাসড়কের রামনগর পিকনিক কর্নারের পাশে পুলিশের সঙ্গে আরেক
'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হন জামায়াতকর্মী শহীদুল।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম আরিফুল হক গত ৬
ফেব্রুয়ারি দাবি করেছিলেন, বৃহস্পতিবার শার্শা থানার পুলিশ শহীদুল ও মজিদকে আটক করে যশোর নিয়ে আসছিল।
পথে যশোর-বেনাপোল সড়কের নতুনহাট এলাকা থেকে তাঁরা পালিয়ে যান। এ ব্যাপারে যশোরকোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে।
শার্শা থানার পুলিশ বলছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বড়
ধরনের কোনো মামলা ছিল না। তাই হাতকড়া না পরিয়ে ভটভটিতে করে তাঁদের আদালতে নেওয়া হচ্ছিল। পথে তাঁরা পালিয়ে যান। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কলারোয়া থানার ওসি শেখ আবু সালেহ মাসুদ করিম দাবি করেন, যশোর থেকে কোনো আসামির পালানোর ঘটনা তিনি জানতেন না। তাঁর ভাষ্য মতে, ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কলারোয়া থানার পরিদর্শক শেখ সফিকুর রহমানের নেতৃত্ব পুলিশের একটি দল যশোর- সাতক্ষীরা মহাসড়কে দায়িত্বরত ছিল। রাত সোয়া ১২টার দিকে ঠাকুরবাড়ী এলাকায় পেঁৗছালে ১০-১২ জন
সন্ত্রাসী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে ও ককটেল নিক্ষেপ করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি করে। একপর্যায়েঅন্যরাপালিয়েগেলেও একজনকে বাঁ পায়ে গুরুতর জখম অবস্থায় আটক করা হয়। জিজ্ঞাসা বাদে তিনি নিজেকে আবদুল মজিদ বলে পরিচয় দেন। ঠিকানা যাচাই করে দেখা যায়, তিনি কলারোয়া পৌর ছাত্রদলের সভাপতি। তাঁর
বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার গড়িবহরে হামলার অভিযোগে মামলা রয়েছে।
মজিদ যে জায়গায় আহত হন, সেই ঠাকুরবাড়ী এলাকা থেকে নতুনহাটের দূরত্ব অন্তত ৬০ কিলোমিটার।
মজিদের পরিবার বলছে, পুলিশের কাছ থেকে যদি পালিয়েই
যাবে তাহলে তো তাঁর (মজিদ) আত্মগোপনে যাওয়ার কথা ছিল।
তা না করে ৬০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে রাতের বেলায় তিনি কেন ফের পুলিশের ওপর হামলা করতে যাবেন?
পরিবারের সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছে, শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা মামলায় গ্রেপ্তার না দেখিয়ে কেন মজিদকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো। পুলিশ ভ্যানের বদলে কেন ভটভটিতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল? আর আসামি পালিয়ে যাওয়ার
বিষয়ে কেন কলারোয়া থানার পুলিশকে কিছু জানানো হয়নি?
আবদুল মজিদের বাবা আবদুস সাত্তারের ভাষ্য মতে, পুলিশকে প্রভাবিত করে আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁর ছেলেকে গুলি করে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন। মজিদের ভগ্নিপতি ইকতেয়ার হোসেন
জানান, গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে সাতক্ষীরা কারাগার ও কেন্দ্রীয় কারাগারের মাধ্যমে মজিদকে ঢাকা হার্ট ফাউন্ডেশনে নিয়ে আসা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, তাঁর (মজিদ) বাঁ পায়ের দুটি প্রধান শিরা রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার কারণে শুকিয়ে গেছে। পা কাটা ছাড়া বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। ওই দিন দুপুর ২টার দিকে তাঁকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। বিকেলে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পা কেটে বাদ দেন।
এ ব্যাপারে পঙ্গু হাসপাতালের অর্থোপেডিকস সার্জন ডা.
মোশারফ হোসেন জানান, এ ধরনের ইনজুরির পর সাত
থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা না হলে শিরাগুলো রক্ত সরবরাহের অভাবে শুকিয়ে যেতে শুরু করে। একপর্যায়ে পচন ধরে মাংসে। মজিদকে বাঁচিয়ে রাখতে পা কেটে বাদ
দেওয়া ছাড়া বিকল্প উপায় ছিল না।
মজিদের ভাই আবদুল আজিজ বলেন, "পুলিশ মজিদকে এক
জায়গাথেকেতুলেনিয়েগাড়িথেকেপালানোর নাটক সাজিয়ে 'বন্দুকযুদ্ধের' নামে তাঁর পায়ে গুলি করে সারা জীবনের
মতো পঙ্গু করে দিয়েছে।
বিষয়টি গত শনিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামালের কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।"
সূত্র -Daily Kaler Kantho - 17-02-2015
|