|
স্বাধীনতাসংগ্রামেরসেই মাস
আজকের কলারোয়া -
01/03/2015
বছর ঘুরে আবার
এলো দ্রোহী চেতনার মাস মার্চ।
বাঙালির স্বাধীনতাসংগ্রামের শুরুর মাস।
বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের
সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের
অগ্নিঝরা মার্চ। মার্চের উত্তাল
গণসংগ্রামের ধারাবাহিকতায়,
রক্তস্রোতে ভেসেই
এসেছে বাঙালির হাজার বছরের
কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। ইতিহাস
সৃষ্টিকারী এই মার্চ তাই বাঙালির
হৃদয়ে চিরজাগরূক-চিরভাস্বর।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির
শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফার
স্বাধিকার আন্দোলন,
আটষট্টিতে বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর
সহযোগীদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার
বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন,
ঊনসত্তরে ছাত্র-জনতার গণ-
অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনের
ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতি ১৯৭১
সালে মার্চের উত্থাল
আন্দোলনে পৌঁছে।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত
আন্দোলনের সূচনা সেই
একাত্তরের পয়লা মার্চ। সত্তরের
জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে এ দেশের
মানুষ আওয়ামী লীগ ও এর
নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমানের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন
জ্ঞাপন করে।
বাঙালি জাতি প্রথমবারের
মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন
দেখে। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক
শাসক ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে ১ মার্চ
দেওয়া বেতার ভাষণে জাতীয়
পরিষদের ৩ মার্চের নির্ধারিত
অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।
বিক্ষোভে উত্তাল হয় রাজপথ। এ
সময় ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) চলছিল পাকিস্তান
বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা।
ইয়াহিয়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সব
দর্শক মাঠ
ছেড়েবেরিয়েএসেবিক্ষোভেযোগ
দেয়। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা স্লোগান
ধরে 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো,
বাংলাদেশ স্বাধীন করো', 'তোমার
আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা',
'তোমার নেতা আমার নেতা- শেখ
মুজিব শেখ মুজিব'। মার্চের প্রথম
সপ্তাহ থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশের
স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়,
অফিস, কল-কারখানা কার্যত বন্ধ
হয়ে যায়। অচল হয়ে পড়ে দেশ।
স্বাধীনতাসংগ্রামের আন্দোলন
তীব্র থেকে তীব্রতর
হয়ে ওঠে। পয়লা মার্চ দুপুর
থেকেই পাকিস্তান সরকারের
সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগ শুরু হয়।
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ২ ও ৩ মার্চ
তৎকালীন পাকিস্তানে সর্বাত্মক
হরতাল পালিত হয়। উত্তোলিত হয়
স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ
পতাকা। ৭ মার্চ তৎকালীন
রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত হয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মোড়
পরিবর্তনকারী ঐতিহাসিক জনসভা। ওই
সময়ের রাজনৈতিক টানাপড়েনের
ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমান বাংলার অবিসংবাদিত
নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
ভেঙে পড়ে ২৪ বছরের
পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা। তৎকালীন পূর্ব
পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর
নির্দেশেই পরিচালিত হয়। পূর্ব বাংলার
গণমানুষের মুকুটহীন সম্রাট
হিসেবে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের
ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন।
তিনি ঘোষণা করেন, 'এবারের সংগ্রাম
মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম
আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।' সেই
শুরু।
একেএকেপেরিয়েআসেঅসহযোগ
আন্দোলনের বিক্ষুব্ধ ২৫টি দিন। ২৫
মার্চ কালরাতে পাকিস্তান
সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর
আক্রমণ চালায়। ওই রাতে গ্রেপ্তার
করে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে।
এর আগে ২৬ মার্চ মধ্যরাতে বিডিআর
ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশের
স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু।
শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
পরবর্তী সময়ে ২৭ মার্চ তৎকালীন
সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র
থেকে বঙ্গবন্ধুর
পক্ষে স্বাধীনতার সেই
ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এরই পথ
ধরে মুজিবনগর সরকারের
নেতৃত্বে ৯ মাসের
রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আমরা পাই
একটি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ।
স্বাধীন বাংলাদেশ আজ বিশ্বের
বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
স্বাধীনতার চার দশকে বাংলাদেশের
অর্জন বিস্ময়কর। অনেক দেশের
কাছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল
দেশের রোল মডেল। কিন্তু
অস্থিরতার দুর্বিপাকে অভ্যন্তরীণ
রাজনীতি। রাজনীতির এক জটিল
ঘূর্ণাবর্তে এবার এসেছে মার্চ।
সরকারবিরোধী রাজনৈতিক
জোটের আহ্বানে টানা দুই মাস
থেকে চলছে অবরোধ। এর
সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরতাল। সাত
দিনের পাঁচ কর্মদিবসে চলছে এই
হরতাল। যার যার অবস্থানে অনড় সরকার
ও আন্দোলনকারী পক্ষ। এর
মধ্যে উচ্চারিত হচ্ছে সংলাপের
আহ্বান। সমাধানের পথ
কারো জানা নেই। এর
সুযোগে জঙ্গিবাদের
হুমকিতে মুক্তবুদ্ধিচর্চার পথ।
আন্দোলন-সংগ্রাম আর প্রেরণার মাস
মার্চ এলেই বাঙালির রক্তে শিহরণ
জাগে।
স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে একাত্তরের
মুক্তিযুদ্ধের সেই
গৌরবোজ্জ্বল উত্তাল দিন। মার্চ
তাই দেশপ্রেমের
প্রেরণা জোগায়। মুক্তিযুদ্ধের
চেতনা সমুন্নত রেখে অসাম্প্রদায়িক
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ
বিনির্মাণে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার
তাড়না জাগায়। সেই উত্তাল মার্চ এবার
আমাদের সংকট উত্তরণের পথ
দেখাক।
|